বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ নদী দখল, দূষণ, নাব্যতা সংকট এবং ভয়াবহ ভাঙনের মতো বহুমুখী বিপর্যয়ের সম্মুখীন। Mookto News জানতে পারে যে, একদিকে অপরিকল্পিত শিল্পবর্জ্য ও নগরীয় বর্জ্যের ভয়াবহ দূষণে নদীর পানি বিষিয়ে উঠছে, অন্যদিকে অবৈধ দখল ও স্থাপনার কারণে নদীরা তাদের স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে ফেলছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক জনজীবনের ওপর।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে Mookto News নিশ্চিত করে যে, রূপসা, ময়ূর, নরসুন্দা, আড়িয়াল খাঁ, করতোয়া, ঘাঘট, কুলিক, চিত্রা ও ধরলাসহ দেশের অসংখ্য নদীর অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কমিশন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে এসব অবৈধ দখল ও দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের মতো প্রধান নদীগুলো বর্তমানে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে।
আমরা জানতে পারি যে, রাজধানী ঢাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী বছরের পর বছর ধরে শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের নালায় পরিণত হয়েছে। একই সাথে উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচ ও কৃষি ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এছাড়া পদ্মা ও যমুনার ভাঙন প্রতি বছর হাজারো পরিবারকে ভূমিহীন ও বাস্তুচ্যুত করছে। নদী বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাব এবং দখলবাজদের দৌরাত্ম্যে নদীর প্রাকৃতিক সীমানা সংকুচিত হয়ে আসছে।
নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা নদী পুনরুদ্ধারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
* নদীর সীমানা পুনর্নির্ধারণপূর্বক অবৈধ দখলদারদের দ্রুত উচ্ছেদ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
* শিল্পকারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন ও এর শতভাগ কার্যকর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
* বৈজ্ঞানিক ও নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও নৌপথ সচল রাখা।
* নদীতীর সংরক্ষণ ও ভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ।
* পানি ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
* স্থানীয় জনগণকে নদী রক্ষায় সরাসরি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা।
Mookto News-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, বর্তমান সরকার নদী সুরক্ষায় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং জেলা ও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সক্রিয়তা বৃদ্ধি করছে। এছাড়া ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা কমিশনের আইনি ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে তিস্তা ও অন্যান্য নদীকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজও সরকারি পর্যায়ে চলমান রয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করে নদী রক্ষা সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদী ব্যবস্থাপনা আগামীতে আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই নদীকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সুসমন্বিত পদক্ষেপই পারে আমাদের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে।
