দুই দশকের অচলাবস্থা: নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পদোন্নতি ও গ্রেড বৈষম্যের সংকটে দিশেহারা কর্মকর্তারা
Mookto News জানতে পারে যে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গ্রেড উন্নীতকরণের প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট চারবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও কোনোটিরই অনুমোদন মেলেনি। এই অচলাবস্থার কারণে কমিশনের বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও পেশাগত অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
২১ বছরেও একই পদে স্থবিরতা
আমরা জানতে পারি যে, ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগদান করা অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘ ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘উপজেলা নির্বাচন অফিসার’ পদেই রয়ে গেছেন। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের মতে, সমসাময়িক ব্যাচের অনেকে ইতিমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও পদোন্নতি বঞ্চিতরা একই পদে আটকে থাকায় সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদার পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। দীর্ঘ সময় একই দায়িত্ব পালন করায় পেশাগত উন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে একঘেয়েমি ও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
ব্যাচমেটদের অধীনে কাজের মনস্তাত্ত্বিক চাপ
Mookto News নিশ্চিত করে যে, পদোন্নতি না পাওয়ার ফলে কর্মক্ষেত্রে অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা জানান, তাদেরই ব্যাচের সহকর্মীরা বর্তমানে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা বা উপসচিবের মতো উচ্চপদে আসীন। ফলে এক সময়ের সহকর্মীর অধীনে অধস্তন হিসেবে কাজ করা অনেক ক্ষেত্রে বিব্রতকর এবং মানসিকভাবে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
গ্রেড বৈষম্য ও প্রশাসনিক অসামঞ্জস্যতা
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে গ্রেড বৈষম্যও একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টিতে ৫ম গ্রেডের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ৪৫টিতে ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। সমপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেও গ্রেডের এই পার্থক্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে ৪৫টি জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করায় নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ও অধস্তন কর্মকর্তার গ্রেড সমান হয়ে যাওয়ায় চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে জনপ্রশাসনের যুক্তি
Mookto News অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে যে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসি সচিবালয় থেকে বারবার পদোন্নতি ও গ্রেড আপগ্রেডেশনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ প্রস্তাবে ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবি জানানো হয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাফ জবাব, একটি দপ্তরের পদমর্যাদা বাড়ানো হলে অন্য সব সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও একই ধরনের দাবি ওঠার সম্ভাবনা থাকে। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসব প্রস্তাবে সম্মতি প্রদানে অনীহা প্রকাশ করে আসছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
এই সংকট নিরসনে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদের মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বঞ্চনা প্রশাসনিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই অসন্তোষ ও হতাশা নির্বাচন পরিচালনার মতো সংবেদনশীল কাজের মান ও গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের ন্যায্য দাবি ও পদোন্নতির জট দ্রুত নিরসন করা অপরিহার্য।
