মাদারীপুরের শিবচরের রাজারচরের বাসিন্দা শাহ আলম হাওলাদারের জীবনে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শোকের ছায়া কাটেনি। Mookto News জানতে পারে যে, ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই বিপ্লবে নিহত ১৭ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে হৃদয় হোসেনের স্মৃতি আজও বাবার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে রেখেছে। বাবা হয়ে সন্তানের নিথর দেহ কাঁধে নেওয়ার যে অসহনীয় যন্ত্রণা, তা শাহ আলমের অশ্রুসিক্ত কন্ঠের বিলাপেই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
আমরা জানতে পারি যে, ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে জুমার নামাজ শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে ঢাকার বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয় হৃদয়। সেদিন টিয়ারশেল ও নির্বিচার গুলির মুখে পড়ে তার বুক ভেদ করে একটি বুলেট। নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তেও রক্তাক্ত ক্ষত চেপে ধরে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিল এই কিশোর। অবশেষে আফতাবনগরের একটি হাসপাতালে হৃদয়ের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে ভেঙে পড়ে তার পরিবার। অমানবিক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এবং শেষ পর্যন্ত নিজের কাঁধে করেই ছেলের মরদেহ নিজ গ্রামে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন শোকার্ত বাবা।
Mookto News নিশ্চিত করে যে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও হৃদয়ের পরিবারে নেমে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার। সংসারের হাল ধরতে অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে কারখানায় কাজ নেওয়া হৃদয় ছিল পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তাকে হারিয়ে বাবা শাহ আলম যেমন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন, তেমনি হারিয়েছেন নিজের উপার্জনের একমাত্র পথ—গাড়িচালকের চাকরিটি।
হৃদয়ের মা নাছিমা আক্তার জানান, সরকারিভাবে প্রাপ্ত মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ওপর নির্ভর করেই চলছে তাদের দৈনন্দিন জীবন। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া পূর্বের সহায়তা ধারদেনা পরিশোধেই শেষ হয়েছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করা এই পরিবারটির একমাত্র আকুতি, সরকার যেন তাদের একটি নিরাপদ আবাসন বা টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।
শহিদ সন্তানের মা হিসেবে নাছিমা আক্তারের আরও প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যেন হৃদয়ের আত্মত্যাগের গল্প পৌঁছে দেওয়া হয়। শিবচরে কোনো সড়ক বা স্থাপনার নামকরণ হৃদয়ের স্মৃতিকে অম্লান রাখবে, যা এই শোকার্ত বাবা-মায়ের জন্য হবে বড় সান্ত্বনা। জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে এই শহিদ পরিবারের রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দাবিই এখন সচেতন মহলের মূল আলোচনার বিষয়। যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে হৃদয় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিল, সেই দেশ যেন তার শোকাতুর পরিবারকে আর অবহেলার অন্ধকারে ফেলে না রাখে।
