২১ বছরের ইতিহাসে দুদকে দীর্ঘতম শূন্যতা: স্থবিরতায় থমকে দুর্নীতি দমন কমিশন।

প্রায় নয় দশক আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।” ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতার যে যন্ত্রণা কবি অনুভব করেছিলেন, তা আজও যেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। দেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকৃত থাকলেও, দুর্নীতির কবলে পড়া মানুষগুলো এই সাংবিধানিক অধিকার থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত। Mookto News জানতে পারে যে, এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে কার্যত নেতৃত্বশূন্য থাকায়।

কমিশনহীনতায় অচল দুদকের কার্যক্রম
দুদকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চেয়ারম্যান ও কমিশনারের অনুপস্থিতি সংস্থাটির প্রশাসনিক ও বিচারিক কার্যক্রমে এক ভয়াবহ স্থবিরতা তৈরি করেছে। Mookto News নিশ্চিত করে যে, কমিশন না থাকায় অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা অনুমোদন, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো আইনি প্রক্রিয়াগুলো এখন পুরোপুরি বন্ধ। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি এমন দীর্ঘমেয়াদী সংকটে আগে কখনো পড়েনি। এ বছরের ৩ মার্চ আগের কমিশনের পদত্যাগের পর ৪ আগস্ট পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিশন আলোর মুখ দেখেনি। এরই মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলে আছে, যা একদিকে অভিযুক্তদের সুবিধা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের করে তুলছে হতাশ।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সার্চ কমিটির ভূমিকা
দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, সার্চ কমিটির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকারি আনুষ্ঠানিকতা শেষে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা উল্লেখ করতে পারেননি তিনি। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মইদুল ইসলামের মতে, আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, যা না হওয়ায় দুর্নীতিবাজরাই লাভবান হচ্ছে। এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট করেছেন যে, কমিশন গঠনে দলীয় বিবেচনা বর্জন করে সৎ, দক্ষ ও নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য। এতেই কেবল দুদকের হারানো জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।

সম্ভাব্য নেতৃত্বের দৌড় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নতুন কমিশন গঠনের লক্ষে গত ২২ জুন বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে গঠিত সার্চ কমিটি তিন শতাধিক আবেদন থেকে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছে। আমরা জানতে পারি যে, আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক বিচারক, আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। চেয়ারম্যান পদে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন। এ ছাড়াও সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, ড. আবুল হোসেন খন্দকার এবং সাবেক সচিব এ এস এম আব্দুল হালিমসহ বেশ কয়েকজনের নাম সম্ভাব্য তালিকায় উঠে এসেছে। তবে অতীতে আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত কমিশনে স্থান না পাওয়ার নজির রয়েছে, তাই শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাবই বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

আইনি কাঠামো ও দুদকের উত্তরাধিকার
দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৫, ৬ ও ৮ অনুযায়ী, কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হয়, যাদের অবশ্যই সততা, সুনাম এবং ২০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে অধিকাংশ কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পদত্যাগের পর চলমান এই পাঁচ মাসের অচলাবস্থা দুদকের দুই দশকের ইতিহাসে দীর্ঘতম কমিশনশূন্য সময় হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। স্বচ্ছ ও কার্যকর কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *